25/10/2026
# ছুটির দেশ বাংলাদেশ :
কারণে-অকারণে যদি কোনো দেশে সরকারি ছুটি হয়, সেই দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। এখানে সরকারের তরফ থেকে কাজের চেয়ে অকাজই যেন বেশি হয়। সারা বছরজুড়ে দেখবেন, খালি সরকারি ছুটি। কারও জন্মদিন, কারও মৃত্যুদিন, বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব—সব মিলিয়ে ছুটির যেন শেষ নেই। এর বাইরেও বিভিন্ন অজুহাতে নানা ধরনের ছুটির ব্যবস্থা করেন সরকারি আমলারা। মনে হয়, কাজের চেয়ে ছুটি কাটানোর প্রতিই তাঁদের আগ্রহ বেশি।
সরকারি কর্মচারীদের সপ্তাহে দুদিন ছুটি দেওয়া হয় কেন, তা বুঝতে পারি না। তার ওপর বর্তমানে কর্মঘণ্টাও এক ঘণ্টা কমানো হয়েছে। অজুহাত ছিল বিদ্যুৎ-সংকট। এখন তো বিদ্যুৎ পরিস্থিতি মোটামুটি ভালো। তাহলে কর্মঘণ্টা আবার বাড়ানো হচ্ছে না কেন? একদিকে কাজের সময় এক ঘণ্টা কমানো হলো, অন্যদিকে বেতন কমানোর পরিবর্তে উল্টো বেতন দ্বিগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। সরকারের পিঠ চাপড়ে দিতে ইচ্ছে করছে!
নীচে বিভিন্ন দেশের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসবের ছুটির পরিমান দেয়া হলো :
দেশ মুসলিম জনসংখ্যা% ছুটি
যুক্তরাষ্ট্র ১.১% নাই
যুক্তরাজ্য ৬.৫% নাই
শ্রীলংকা ১০.৫% ১ দিন
নেপাল ৬.৫% ১+১দিন
ভুটান ১% নাই
চীন ১.৫% নাই
ভারত ১৫.৫% ১+১দিন
থাইল্যান্ড ৫% ১+১দিন
তবে থাইল্যান্ডে এই ছুটি পুরো থাইল্যান্ডের জন্য প্রযোজ্য নয়। শুধু মুসলিম প্রধান অঞ্চলের জন্য।
এখন দেখা যাক বাংলাদেশের অবস্থা কি?
এবার দেখা যাক বাংলাদেশের অবস্থা
বাংলাদেশে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জনসংখ্যার অনুপাত এবং তাদের ধর্মীয় উৎসবের ছুটির চিত্র নিচে দেওয়া হলো :
ধর্মীয় সম্প্রদায় সংখ্যা % ছুটি
হিন্দু ১৫.৫% ২ দিন
বৌদ্ধ .৬১% ১ দিন
খ্রিস্টান .৩০% ১ দিন
লক্ষ্য করুন, ২ শতাংশ বা তার চেয়ে কম জনসংখ্যার ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য অনেক দেশে জাতীয় পর্যায়ে আলাদা ধর্মীয় ছুটি নেই। ভারতে প্রায় ১৫–১৬ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যার জন্য ঈদ উপলক্ষে ছুটির সংখ্যা সীমিত। এসব দেশের ছুটির নীতির পেছনে একটি যুক্তি কাজ করে—একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উৎসব পালনের সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক কর্মজীবনও সচল রাখা।
অল্পসংখ্যক মানুষের ধর্মীয় উৎসবের জন্য পুরো দেশের কাজকর্ম বন্ধ রাখা কতটা যুক্তিসংগত, তা ভেবে দেখা দরকার। তবে ধর্মীয় উৎসব পালনের অধিকার অবশ্যই সবার থাকা উচিত।
কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাপারটাই আলাদা। এখানে ছুটি যেন খুব জনপ্রিয় একটি বিষয়। আমাদের কর্মসংস্কৃতিতে কাজের প্রতি অনীহা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ আছে। বিশেষ করে সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশের কর্মদক্ষতা, দায়িত্ববোধ ও কর্মঘণ্টার যথাযথ ব্যবহারের বিষয়ে প্রশ্ন ওঠে। এমনও মনে হয়, অনেকের কাছে অফিসে যাওয়ার প্রধান কারণ কাজের দায়িত্ব পালন নয়, বরং অন্য কোনো সুবিধা পাওয়া। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন।
২০২৫ সালের আগে পূজার সরকারি ছুটি ছিল এক দিন। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে হঠাৎ করেই সেই ছুটি বাড়িয়ে দুই দিন করা হয়। একই সময়ে ছুটির দিনগুলোকে জুড়ে দিয়ে দীর্ঘ ছুটি তৈরির একটি প্রবণতা আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
যেমন, শনিবার সরকারি কর্মচারীদের সাপ্তাহিক ছুটি। সেই শনিবারের পরিবর্তে বৃহস্পতিবার অফিস বন্ধ রেখে ছুটি দেওয়া হলো। ফলে মঙ্গলবার থেকে শনিবার পর্যন্ত দীর্ঘ বিরতি তৈরি হলো। এর ফলে ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজকর্মে দীর্ঘ সময়ের জন্য বিঘ্ন ঘটতে পারে।
মাত্র ৬–৭ শতাংশ মানুষের ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে সারা দেশের কাজকর্ম টানা কয়েক দিন বন্ধ রাখা কতটা যুক্তিসংগত, তা ভেবে দেখা দরকার। হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে অবশ্যই ছুটি থাকা উচিত। কিন্তু সেই ছুটি কি সবার জন্য প্রযোজ্য না করে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের জন্য নির্দিষ্ট করা যায় না? এতে তাঁদের ধর্মীয় উৎসব পালনের সুযোগও থাকবে, আবার দেশের সামগ্রিক কর্মজীবনও সচল রাখা সম্ভব হবে।
আমার সন্দেহ, দীর্ঘ ছুটির এই ব্যবস্থা কেবল ধর্মীয় সম্প্রদায়কে খুশি করার বিষয় নয়; এর পেছনে সরকারি কর্মচারীদের ব্যক্তিগত সুবিধার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়। অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছেলেমেয়ে বিদেশে থাকে, সেখানে পড়াশোনা করে। অনেকে আবার বিদেশেই স্হায়ীভাবে থাকার ব্যবস্থা করেছে। দীর্ঘ ছুটি তাঁদের বিদেশ সফর ও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ করে দেয়। অবশ্য এই ধারণার পক্ষে নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া একে সবার ক্ষেত্রে সত্য বলে দাবি করা যায় না। তবে সরকারি ছুটির নীতি নির্ধারণে ব্যক্তিগত সুবিধার পরিবর্তে জনস্বার্থই যে প্রাধান্য পাওয়া উচিত, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
এইভাবে ছুটি দীর্ঘ করার প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, যেসব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা ১ শতাংশেরও কম, তাদের ধর্মীয় উৎসবের জন্য ছুটি শুধু সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের সদস্যদের জন্য নির্ধারণ করা কি অধিক যুক্তিসংগত নয়?
সারা বছর অন্যান্য দেশে কত দিন সরকারি ছুটি থাকে?
নিচে বিভিন্ন দেশের বাৎসরিক সরকারি ছুটির একটি তুলনামূলক তালিকা দেওয়া হলো।
দেশ ছুটি
যুক্তরাষ্ট্র ১১ দিন
যুক্তরাজ্যে ৮ দিন
চীন ১৩ দিন
জাপান ১৬ দিন
পাকিস্তান ১২ থেকে ১৬ দিন
তুরস্ক ১৫ দিন
থাইল্যান্ড ১৯ দিন
সিঙ্গাপুর ১১ দিন
ভুটান ১৬ থেকে ২১ দিন
ভারত ১৭/১৮ দিন
নেপাল ৩৫ দিন (সারা বিশ্বে সর্বোচ্চ)
তালিকা অনুযায়ী, নেপালে সরকারি ছুটির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তবে বিভিন্ন দেশে ছুটির হিসাব করার পদ্ধতি এক নয়। কোথাও জাতীয় ছুটি, কোথাও আঞ্চলিক ছুটি, আবার কোথাও ঐচ্ছিক ছুটি আলাদাভাবে গণনা করা হয়। তাই সঠিক তুলনার জন্য একই ধরনের ছুটি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
এবার বাংলাদেশের হিসাব
বাংলাদেশে সারা বছরে সরকারি ছুটির সংখ্যা ২৮ দিন বলে উল্লেখ করা হয়। এর বাইরে ঐচ্ছিক ছুটির ব্যবস্থাও রয়েছে। তোমার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত সম্প্রদায়ের জন্য ঐচ্ছিক ছুটির সংখ্যা নিম্নরূপ:
সম্প্রদায় ঐচ্ছিক ছুটি
মুসলিম ৫ দিন
হিন্দু ৯ দিন
খ্রিস্টান ৮ দিন
বৌদ্ধ ৭ দিন
ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ২ দিন
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ঐচ্ছিক ছুটি আর সবার জন্য প্রযোজ্য সাধারণ সরকারি ছুটি এক বিষয় নয়। ঐচ্ছিক ছুটি সাধারণত সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর ধর্মীয় বা অন্যান্য বিবেচনার ভিত্তিতে নেওয়া হয়।
সপ্তাহে দুদিন ছুটির সুবিধাও রয়েছে। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া সরকারি কর্মচারীরা এই সুবিধা ভোগ করেন। সে হিসাবে বছরে সাপ্তাহিক ছুটির সংখ্যা প্রায় ১০৪ দিন। কোনো কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে এক দিন ছুটি থাকায় সরকারি কর্মচারীদের তুলনায় তাঁরা বছরে প্রায় ৪৮ দিন কম সাপ্তাহিক ছুটি পান। এর বাইরে বিভিন্ন কারণে বিশেষ ছুটিও ঘোষণা করা হয়।
ফলে সরকারি কর্মচারীদের মোট কর্মদিবস ও কর্মঘণ্টার হিসাবটি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা দরকার। শুধু ছুটির সংখ্যা নয়, প্রকৃত কাজের পরিমাণ, কর্মদক্ষতা এবং জনগণকে দেওয়া সেবার মানও বিবেচনায় নিতে হবে।
কথায় কথায় ছুটি, কিন্তু কাজের হিসাব কোথায়?
পরিশেষে বলা যায়, কথায় কথায় সরকারি ছুটি দেওয়ার প্রবণতা বাংলাদেশের একটি বড় সমস্যা বলে আমার মনে হয়। এর পেছনে সরকারের নীতিনির্ধারণী দুর্বলতা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সরকারি কর্মচারীদের একটি অংশের দায়িত্বহীনতা, কাজের প্রতি অনিহা, কাজের চেয়ে জনসংখ্যা বেশী হওয়া ও জবাবদিহিতার অভাব।
দেশের মানুষের করের টাকায় সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া হয়। তাঁদের দায়িত্ব হচ্ছে জনগণকে সেবা দেওয়া এবং দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখা। অথচ যখন কাজের চেয়ে ছুটির প্রতি আগ্রহ বেশি দেখা যায়, তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—দেশের প্রতি তাঁদের দায়বদ্ধতা কতটা?
দেশ থেকে অর্থ লুটপাট ও বিদেশে পাচারের ঘটনাও আমাদের সামনে রয়েছে। এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারি কর্মচারীদের সবাইকে এক কাতারে ফেলা ঠিক হবে না, তবে যাঁরা দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেন কিংবা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনতেই হবে।
আমাদের ভাবতে হবে, দেশের জন্য কোনটি বেশি প্রয়োজন—আরও ছুটি, নাকি আরও কার্যকর কর্মসংস্কৃতি?
দেখুন, ভারতসহ অনেক দেশে সপ্তাহে এক দিন সাপ্তাহিক ছুটির ব্যবস্থা রয়েছে। আবার বিভিন্ন দেশের বাৎসরিক সরকারি ছুটির সংখ্যাও বাংলাদেশের চেয়ে কম। এর পেছনে কর্মঘণ্টার মূল্য, উৎপাদনশীলতা এবং জনসেবা সচল রাখার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদেরও এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।
সরকারের কাছে কয়েকটি প্রস্তাব
প্রথমত, সাপ্তাহিক ছুটি পুনর্বিবেচনা করা।
আমাদের দেশে কাজের পরিমাণ, সরকারি সেবার চাহিদা এবং কর্মদক্ষতার বিষয়গুলো বিবেচনা করে সপ্তাহে দুদিনের পরিবর্তে এক দিন সাপ্তাহিক ছুটির ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কর্মীদের স্বাস্থ্য, কাজের চাপ, উৎপাদনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক শ্রমমানের বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বাৎসরিক সরকারি ছুটির সংখ্যা যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসা।
বিশেষ করে ধর্মীয় উৎসবের ছুটির ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের নীতি পর্যালোচনা করা যেতে পারে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসবের ছুটি সবার জন্য সাধারণ ছুটি হিসেবে না দিয়ে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের সদস্যদের জন্য নির্দিষ্ট করা যায় কি না, তা বিবেচনা করা উচিত। প্রয়োজনে তাঁদের ধর্মীয় উৎসব পালনের জন্য ঐচ্ছিক ছুটি বাড়ানো যেতে পারে। এতে ধর্মীয় স্বাধীনতাও বজায় থাকবে, আবার দেশের সামগ্রিক কর্মজীবনও সচল থাকবে।
এ প্রসঙ্গে ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’—এই বহুল প্রচলিত স্লোগানটি নিয়েও আমার কিছু প্রশ্ন রয়েছে। জানি না, এই ধারণাটি কীভাবে এত ব্যাপকভাবে প্রচলিত হলো। ধর্মীয় উৎসবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ধর্মের বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের সম্পর্ক রয়েছে। তাই সবাইকে একইভাবে প্রতিটি ধর্মীয় উৎসবে অংশ নিতে হবে, এমন ধারণা কতটা যুক্তিসংগত?
আমাদের দেশে হিন্দু ও মুসলিম—এই দুই সম্প্রদায়ের মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। হিন্দু ধর্মের অনেক উৎসবে প্রতিমাপূজা একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যদিকে, ইসলাম ধর্মে প্রতিমাপূজা নিষিদ্ধ। তাহলে একজন মুসলমান কীভাবে অন্য ধর্মের এমন একটি ধর্মীয় আচারকে নিজের উৎসব হিসেবে গ্রহণ করবেন? অবশ্য অন্যের ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো আলাদা বিষয়।
আবার মুসলমানদের কোরবানির ঈদের কথাই ধরুন। এ উপলক্ষে ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা পশু কোরবানি করেন, যার মধ্যে বাংলাদেশে গরু কোরবানি প্রচলিত। অন্যদিকে, হিন্দু ধর্মের অনেক অনুসারীর কাছে গরু পবিত্র এবং তাকে দেবি মানা হয়। তাদের পক্ষে কিভাবে এই উৎসবে যোগ দেয়া সম্ভব? ফলে একই ধর্মীয় আচারকে সবাই একইভাবে উদ্যাপন করবেন, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
তাহলে ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ স্লোগানটি কি সব ধর্মীয় উৎসবের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য? আমার মনে হয়, এ বিষয়ে আরও বাস্তবসম্মত ও সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের উৎসবের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবেন, একে অন্যের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বিশ্বাসকে সম্মান করবেন—এটাই হওয়া উচিত মূল কথা।
আমার প্রস্তাব হচ্ছে, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য আগের মতো এক দিন রাষ্ট্রীয় সাধারণ ছুটি রেখে তাঁদের ধর্মীয় উৎসব পালনের জন্য প্রয়োজনে অতিরিক্ত ঐচ্ছিক ছুটির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একই নীতি অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে তাঁদের ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ণ না করেই সারা দেশের কাজকর্ম সচল রাখার সুযোগ তৈরি হবে।
তৃতীয়ত, মন্ত্রী ও আমলাদের কর্মঘণ্টা ও দায়িত্ব পালনের বিষয়ে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মঘণ্টা যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত কাজের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তবে সেই ভাতা যেন প্রকৃত কাজ না করেই নেওয়া না যায়, সে জন্য কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকতে হবে।
শুধু কর্মঘণ্টা বাড়ালেই হবে না; সেই সময়ে কতটা কাজ হচ্ছে, জনগণ কতটা সেবা পাচ্ছে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা কতটা বাড়ছে, তারও মূল্যায়ন করতে হবে।
সবশেষে বলতে চাই, একটি দেশের উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা বাজেটের আকার দিয়ে বিচার করা যায় না। দেশের মানুষের কর্মসংস্কৃতি, সরকারি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা এবং জনগণের প্রতি দায়িত্ববোধও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।
সরকারি ছুটি মানুষের ন্যায্য অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই ছুটি কমানোর প্রশ্নটি বিবেচনা করতে হবে যুক্তি, বাস্তবতা ও জনস্বার্থের ভিত্তিতে। একই সঙ্গে এটাও নিশ্চিত করতে হবে, ছুটি যেন কাজ এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতিতে পরিণত না হয়।
আমরা চাই, সরকারি কর্মচারীরা যথাযথ ছুটি ভোগ করবেন, তাঁদের ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত অধিকার বজায় থাকবে; পাশাপাশি তাঁরা দায়িত্বও যথাযথভাবে পালন করবেন। কারণ, সরকারি চাকরি শুধু বেতন ও ছুটি ভোগের বিষয় নয়; এটি জনগণের প্রতি দায়িত্ব পালনেরও অঙ্গীকার।