10/09/2026
মাছ আর বাঙালি
বাঙালি টাকার কুমীর বা জামাইষষ্ঠীর দিনে দু-চারজন ভাগ্যবান নতুন জামাই, আর শোনা যায় যাত্রার দলের হিরোরা ছাড়া রুই মাছের মুড়ো বা রুই মাছ খাওয়া এখন সাধারণ বাঙালির কাছে স্বপ্ন হয়ে গেছে।
বাঙালির কাছে রুই মাছের মুড়ো যে কত লোভনীয় ব্যাপার তার একটা নমুনা দি। 'নৌকাডুবি'তে রমেশ ইস্টিমারের খালাসিদের কাছ থেকে রুই মাছ কিনে কমলাকে দিলে কমলা তার মুড়ো রমেশকে খাওয়ালে অবাক রমেশ বলে, 'এতো স্বপ্ন নয়, মায়া নয়, মতিভ্রম নয় এ যে সত্যিই মুড়ো-যাহাকে বলে রোহিত মৎস্য তাহারই উত্তমাঙ্গ।'
সে যাই হোক তবুও এই আগুন দামের দিনে থলে হাতে মাছের বাজারে লোকের ভিড় দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয়। এর কারণ গেরস্ত এমন কি গরিব বাঙালিদের সরু এক ফালি মাছ টাকা না দিলে বা চুনোপুঁটির গন্ধ না পেলে পোড়া মুখে ভাত রোচে না।
মাছ ধরার সুখের কথা না থাকলেও মাছ খাওয়ার সুখের জন্যে আজও নিরামিষের মতন বাংলার মাছ। রান্নার কায়দার রকমারিত্বর শেষ নেই। সুখের বিষয় ঠাকুমা-দিদিমা-মা-মাসীদের কাছ থেকে শেখা এইসব পাক-প্রণালী এখনও বর্ষীয়ান মহিলাদের দৌলতে টিকে আছে। তবে কতদিন এসব রান্না বজায় থাকবে তা ভগবানই জানেন। এর মধ্যেই বহু ঝকঝকে তকতকে রান্নাঘর থেকে সেই চিরকেলে শিল-নোড়া, আঁশ বটি আর আঁশ চুপড়ি বিদেয় নিয়েছে।
কেবল এইটুকু বলতে চাই যে বাঙালিরা মাছ রাঁধেন পুড়িয়ে, সেঁকে, ভেজে, ভাপে সেদ্ধ করে, ঝাল, ঝোল, টক আর অজস্র রকম সাধারণ আর পোশাকি তরকারি করে যার ফিরিস্তি দিতে গেলে পাতার পর পাতা ভরে যাবে।
কামুকের কত সুখ কুলটার কোলে।
রসনা যে সুখ পায় এ মাছের ঝোলে॥
পলান্নের রাজা মাছ না হয় এমন।
সুধার আধার এই রুয়ের ব্যঞ্জন ॥
বল দেয় বুদ্ধি দেয় বাত নাশ করে।
নয়নের জ্যোতি বাড়ে মুড়া খেলে পরে ॥
এখানে একটা ছোট টিপ্লনী দিতে চাই। আমায় সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি শ্রদ্ধেয় শ্রীঅজিতনাথ রায় মশাই একবার বলেছিলেন যে ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় বলতেন যে যদি কেউ ভাতের সঙ্গে রোজ একবাটি মাছের ঝোল খায় তার অন্যকিছু খাবার দরকার হয় না।
তারপর শ্রীরায় আফশোষ করছিলেন যে আগেকার দিনের মা-মাসী বা বামুন-দাদার মতন মাছের ঝোল এখন আর কেই বা রাঁধতে পারেন। মাছের ঝোলের প্রসঙ্গ উঠলেই আবার রবীন্দ্রনাথের শরণাপন্ন হতে হয়। 'চোখের বালি'তে বিহারী কতবার যে তার 'মাসীমা' রাজলক্ষ্মীর রাঁধা মাছের ঝোলের গুণগান করেছে তার ইয়ত্তা নেই।
আবার একটা প্রবাদের কথা মনে পড়ছে:
জোলা মরে তাঁতে।
বাঙালি কাঙালি মরে মাছে আর ভাতে।
মাছ ছাড়া বাঙালির জীবন ভাবা যায় না যেমন কালো ছাড়া কাক, সাদা ছাড়া বরফ ভাবা যায় না।
শচীন দেববর্মণ এর প্রসঙ্গে ব্রজেন বিশ্বাসের স্ত্রী, গীতা বিশ্বাস জানালেন, 'শুধু কি কর্তার গানের কথাই জানতে চান। আর কিছু না। আমার হাতের রান্না খেতে খুউব ভালবাসতেন। ডাকতেন 'বড় বউমা' বলে। যখনই কলকাতায় আসতেন, রান্না করে খাওয়াতাম। খুউব প্রিয় ছিল লাউচিংড়ি, চিংড়িমাছের মালাইকারি আর মুড়িঘন্ট। ঘাটিরা যেরকম ডালে মাছের মাথা দিয়ে করে, সেটা না। বলতেন, 'আমাগো দ্যাশের মুড়িঘন্ট খামু। বড় রুই মাছের মাথা আর চাল দিয়ে যেটা রান্না হয়। খাইয়ে খুব তৃপ্তি পেতাম।
এরকম আরো পড়তে ঘুরে আসুন
https://www.foodcooking-inspiration.in/2013/11/fries-and-fritters.html